বৃহস্পতিবার, ২৫ Jun ২০২৬, ০৩:৫১ অপরাহ্ন
দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল ঈদ আনন্দের। ঈদুল ফিতরের টিভি আয়োজনও শেষ হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারের ঈদেও নির্মাতারা নানা কনটেন্ট নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল এক পর্বের নাটক, সাতদিনের ধারাবাহিক, ফ্ল্যাশ ফিকশন, টেলিফিল্ম, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি। সাধারণ দর্শকের কাছে বহুদিন ধরে ঈদ মানেই নাটক।
টেলিভিশন চ্যানেলে নাটক দেখেই তারা ঈদের সময়টা পার করতেন। বাংলাদেশের নাটক নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দর্শকও প্রশংসা করেছেন নানা সময়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে জায়গা হারিয়ে ফেলেছে দেশের টিভি নাটক। নানা কারণেই গত কয়েক বছরে নির্মিত ও প্রচারিত নাটক নিয়ে আপত্তি দর্শকদের। সারা বছর যাই হোক ঈদের নাটক নিয়ে বরাবরই ভালো প্রত্যাশা থাকে দর্শকের। এই সময়টাতে আয়েশ করে নাটক দেখতে বসেন পরিবারের সবাই মিলে। কিন্তু হতাশ হতে হয়েছে ঈদ আয়োজনে ঈদের নাটকে। এবারের ঈদে কয়েকশ নাটক প্রচারিত হয়েছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও ইউটিউবে। তবে এবার কোনো নাটকই হয়ে ওঠেনি ‘টক অব দ্য টাউন’। কিছু নাটক আলোচনায় এলেও তেমন সাড়া মেলেনি। টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি ইউটিউবে প্রকাশিত কিছু নাটক ভিউ পেয়েছে অনেক। কিন্তু নাটক নিয়ে পুরানো সে মুগ্ধতা আর নেই। দর্শকদের অভিযোগ, একই ধারার নাটক তৈরি হচ্ছে। নতুনত্ব নেই কনটেন্টে।
এবার নতুনদের জোয়ার বইলেও দর্শক নজরে আসেনি কেউ। টিভি চ্যানেলের নাটকগুলোয় ছিল ঘুরেফিরে পরিচিত মুখ। প্রতি ঈদেই নাটক প্রচারের পর তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা দেখা যায়। তবে এবার নাটক নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই নেই। দর্শক ভিউয়ে এগিয়ে থাকা নাটকগুলো নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। খাপছাড়া মানহীন গল্প, অসার সংলাপ আর দুর্বল অভিনয় দর্শকের মন ভরাতে পারেনি। নাটকের নামকরণ, কিছু নাটকের দৃশ্যায়ন, শব্দচয়ন নিয়ে আপত্তি দেখা গেছে।
নাটকে অকারণেই গালি, ভিপ ব্যবহার, অশ্লীল ভঙ্গি দেখানোর ব্যাপারে অনেকদিন ধরেই দর্শক অভিযোগ করে আসলেও থেমে ছিল না এবারের ঈদ নাটকে। এবার রোজার ঈদে বাংলাদেশে ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে শীর্ষে রয়েছে নাটক ‘বিদেশ’। কয়েক তরুণের বিদেশ যাওয়ার গল্প নিয়ে নির্মিত এ নাটকটি প্রথম তিন দিনে ৭২ লাখের বেশি বার দেখা হয়। কাজল আরেফীন অমি পরিচালিত নাটকটিতে অভিনয় করেছেন মিশু সাব্বির, পলাশ, পারসা ইভানা, শিমুল, পাভেল প্রমুখ।
তিন দশকের জনপ্রিয়তা অবশ্য ধরে রেখেছে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। এবারও অসংখ্য মানুষ দেখেছেন এই অনুষ্ঠানটি। হানিফ সংকেতের পরিচালনায় এই ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি রয়েছে ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে ২ নম্বরে। বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে একযোগে প্রচারের পর ফাগুন অডিও ভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে এটি প্রচার হয়।
তিন দিন ইউটিউবে ৫০ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে ঈদের ইত্যাদি। ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে ৩ নম্বরে রয়েছে নাটক ‘ঈদ সেলামি’। ঈদের সালামি নিয়ে মানবিক গল্পে নির্মিত এ নাটকটি পরিচালনা করেছেন রাফাত মজুমদার। ‘ঈদ সেলামি’র পরেই জায়গা করে নিয়েছে মহিন খানের পরিচালনায় জামাই-শ্বশুরের নানা রকম হাস্যরসাত্মক কর্মকাণ্ড নিয়ে নাটক ‘দুষ্টু শ্বশুর মিষ্টি জামাই’। নাটকে জামাই চরিত্রে নিলয় আলমগীর ও শ্বশুর চরিত্রে মাসুম বাশার অভিনয় করেছেন। নাটকটিতে অভিনেত্রী জান্নাতুল হিমিও অভিনয় করেছেন। ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ে ৪ নম্বর রয়েছে নাটকটি। এছাড়া ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে ‘লাভ ইউ ভাইয়া’, ‘পিতা মাতা সন্তান’, ‘সুইট কিস’, ‘নেভার সিরিয়াস’, ‘চোখের ক্ষুধা’, ‘পোস্টম্যান’, ‘কিউট প্রেমিক’, ‘চৌধুরী’, ‘পিনিক ম্যান-২’, ‘তোমাকেই খুঁজে বেড়াই’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘ঈদ মোবারক বাবা মা’, ‘গোলমাল ভিলা’, ‘ফ্লাটম্যাট’, আরটিভির ‘ঘুম’, অপূর্ব-তারিন অভিনীত ‘প্রিয় পরিবার’ নাটকগুলো। টিভি চ্যানেল ও ইউটিউবের নাটকগুলো সাড়া না ফেললেও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্টগুলোতে দর্শক অনেকটা স্বস্তি খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে হইচইয়ে মুক্তি পাওয়া আশফাক নিপুণের সিরিজ মহানগরের দ্বিতীয় পর্ব। ঈদের একদিন আগে স্ট্রিম হওয়া এ সিরিজ নিয়ে দর্শক উচ্ছ্বসিত। প্রথম সিজন থেকেই এ চাহিদা ছিল। দ্বিতীয় সিজন দর্শক আরও পছন্দ করার পাশাপাশি এখন অপেক্ষা মহানগরের তৃতীয় সিজনের জন্য। একইভাবে দর্শক পছন্দ করেছেন শিহাব শাহীনের ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’। কাজল আরেফিন অমি এবার বঙ্গর জন্য নির্মাণ করেছিলেন অরিজিনাল সিরিজ ‘হোটেল রিল্যাঙ্ক’। দর্শকের কাছ থেকে খুব একটা ইতিবাচক সাড়া না পেলেও নতুন কিছু চেষ্টা করার বিষয়টি তারা পছন্দ করেছে। মিজানুর রহমান আরিয়ান নির্মাণ করেছেন ফ্ল্যাশ ফিকশন ‘শহরে অনেক রোদ’। দীপ্ত প্লেতে প্রচারিত হয় এটি। শাফায়েত মনসুর রানা অভিনয় করেছিলেন বিজ্ঞের ‘কুহেলিকা’য়।
নির্মাতা ও নাট্যসংশ্লিষ্টদের মতে, টেলিভিশন চ্যানেলে ভালোমানের নাটক কমে যাচ্ছে। বহু আগে থেকে আমরা বলে আসছি একটি ভালো নাটকের জন্য ভালো বাজেট দরকার। এক সময় একুশে টিভি সেইসময় ভালো বাজেট দিত। কিন্তু এখন প্রায় সব চ্যানেল কম বাজেটে নাটক করতে চায়। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীর নামও বলে দেওয়া হয়। কিন্তু ওটিটি আসার কারণে এখন নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীরা সেদিকে ঝুঁকছেন। এখানে কাজের অনেক সুবিধা। ভালো বাজেটে এখানে ভালো কাজ হচ্ছে।
নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীরা ভালো সম্মানী পাচ্ছেন। যেখানে কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে সবাই আগ্রহী হচ্ছেন। টেলিভিশনে তারকাশিল্পীদেরও উপস্থিতি কম। অনেক নির্মাতা এখন ওটিটির কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। টিভি চ্যানেল তাদের চিন্তার পরিবর্তন না করলে ধীরে ধীরে এই সংকট থেকে যাবে। তবে ওটিটির কাজ নিয়ে আগ্রহী হলেও সুযোগ-সুবিধা ভালো হলে টিভি চ্যানেলের কাজ নিয়ে থাকতে চান নির্মাতারা।